অ্যাডেলফি গ্লোবাল
তাপপ্রবাহে বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ কর্মদিবস নষ্ট হতে পারে শ্রমিকদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আপডেট: ২০২৬-০৭-১৯ ২২:২০:৩৬
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশকে আরও উষ্ণ করে তুলছে না, বরং লাখ লাখ পরিবারকে আরও গভীর আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে শ্রমিকদের আয় যেমন কমছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা খরচ।
‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং—আ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জার্মানি-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল।
রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপপ্রবাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ভারত ও নাইজেরিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশেও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের আধিক্য, স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত উচ্চব্যয় ও সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ঝুঁকি আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
আটটি দেশের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার তথ্য প্রথমবারের মতো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা হয়েছে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ একইসঙ্গে মানুষের আয় কমায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়।
গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এসব খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
একই সময়ে সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা, যাদের অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
একই সময়ে মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ২০০০ সালের তুলনায় ৮৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা বাড়লে এই আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী দশকগুলোতেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল আর্দ্রতা-ভিত্তিক উচ্চ থেকে অতি-উচ্চ তাপ-ঝুঁকির সম্মুখীন হবে, যেখানে বছরের ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় কিছু কিছু খাতে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
ল্যানসেটের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশ আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতা হারিয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
তাপপ্রবাহের সময় ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাট এই প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি একদিকে শ্রমিক, কারখানা কর্মী ও সাধারণ মানুষকে ঘরের ভেতরে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় থাকতে বাধ্য করে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
অ্যাডেলফির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনীতি এই তিন খাতকে আর আলাদাভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষার জন্য জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি করা।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














