পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবে ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে
জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২৬-০৯-১৫ ১৩:১১:৫৬
দেশে চারটি ইলিশ প্রজনন কেন্দ্র ও ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে। ইলিশ প্রজনন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি অবস্থিত চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ডোমাখালী-সাহেরখালী বঙ্গোপসাগর মোহনায়। কিন্তু শিল্পায়নের কারণে ইলিশ প্রজনন কেন্দ্রটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে উৎপাদন। সেই সঙ্গে কমেছে আহরণও। একসময় জেলে নারীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ইলিশ বিক্রি করতেন। কিন্তু সে চিত্র এখন কালেভদ্রেও চোখে পড়ে না। তবে আশার কথা হলো গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ইলিশ আহরণ বেড়েছে দ্বিগুণ।
জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত আহরণে ওঠানামা রয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্র বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণ হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন।
এদিকে মিরসরাই সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে মিরসরাইয়ে মোট ইলিশ আহরণ হয় ১৪৭ দশমিক ৪ টন। ২০২৩ সালে আহরণ হয় ১১৬ টন। ২০২৪ আবারো বড় ধরনের ধাক্কা খায় ইলিশ আহরণে। ওই বছর ইলিশ আহরণ হয় মাত্র ৩৬ দশমিক ৪৯ টন। এক ধাক্কায় ইলিশ আহরণ কমে যায় ৭৯ দশমিক ৫১ টন। ২০২৫ সালে আহরণ হয় ২৫ দশমিক ৮০ টন। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আহরণ হয় ৫২ দশমিক ৫২ টন।
মিরসরাইয়ের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জেলেদের সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছি-ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ইলিশ উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলায় ইলিশ আহরণ কমছে। তবে চলতি বছর গত বছরের তুলনায় ইলিশ উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়েছে। আমরা ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে বন্ধের দিনগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলেপাড়ায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ২ হাজার ৫৫৭ জন। ২০১৬ সালের আগে ২০২৬ জন জেলে নিবন্ধিত হন। ২০২১ সালে নিবন্ধিত হন ১শ জন। এর পরের বছরগুলোতে নিবন্ধন পান আরো ৪৩১ জন জেলে।
এদিকে সাগরে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে সরকার প্রত্যেক বছর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এগুলো হলো দুই দফায় ৮৭ দিনের মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা, আট মাসব্যাপী জাটকা নিধন ও সংরক্ষণ নিষেধাজ্ঞা ও জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন। ওই সময় উপজেলার ২ হাজার ১২৬টি জেলে পরিবারকে দুই দফায় ৮৬ কেজি চাল সহায়তা দেয়া হয়। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে সরকার ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ বন্ধে উপজেলার ১ হাজার ৫শ টি জেলে পরিবার পায় ২৫ কেজি চাল। এছাড়া নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ৮ মাসের জাটকা নিধন নিষেধাজ্ঞায় ৬২০ পরিবারকে প্রত্যেক মাসে ৪০ কেজি চাল দেয়া হয়। তবে আট মাসের বন্ধে জেলেরা ভিজিএফ সহায়তা পায় মাত্র চার মাস। স্থানীয়রা জানান, প্রজনন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাইয়ের মায়ানি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের জেলে মরণজিৎ জলদাশ জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর যৎসামান্য বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে গভীর সমুদ্র ছাড়া এখন ইলিশ পাওয়া যায় না। যে ইলিশ পাওয়া যায় তা দিয়ে খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলার জয়নগর গ্রামের জেলে লক্ষণ জলদাশ বলেন, প্রতি বছর মৌসুম এলেই দাদনে জাল কিনতে হয়। পরে ইলিশ আহরণ করে দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হয়। বিগত কয়েক বছর ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ায় দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে সাগরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে।’
ডোমখালী জলদাশ পাড়ার জেলে রতন জলদাশ জানান, তার ৬ সদস্যের সংসার। প্রত্যেক বছর ইলিশের মৌসুম এলে দাদনে জাল ক্রয় করেন। পরে ইলিশ মাছ আহরণ করে সেই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ইলিশ মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় দাদনের টাকা পরিশোধ করতে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এছাড়া বছরে দুই বার মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, ইলিশ আহরণে জ্বালানি খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়। সাগরে বেশি সময় অবস্থান করতে হলে ট্রলার ও নৌযানে জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে মাছ আহরণের মোট খরচও বাড়ে, যার প্রভাব বাজারের দামে পড়তে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে গত ২০ জুলাই চাঁদপুরে পাঁচ সদস্যের একটি দল মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শুরু করে। দলটি জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জেলের সংখ্যা, সরকারি সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রণোদনা এবং ইলিশ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে মাছঘাটে জেলে, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ক্রেতাদের সঙ্গেও কথা বলে।
আনিসুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে আগের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম এবং বড় আকারের ইলিশের সংখ্যাও কম দেখা যাচ্ছে। তবে এখনই কোনো একটি কারণকে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। নদীর পানির গুণগত মান, স্রোত, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইলিশের চলাচলের পথসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের গবেষণাতেও ইলিশের আকার ছোট হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তার গবেষণা অনুযায়ী, ইলিশের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষণায় এর অন্যতম কারণ হিসেবে নদীদূষণের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ নদীর পানির গুণগত পরিবর্তন শুধু ইলিশের প্রজনন নয়, তার খাদ্যপ্রাপ্তি ও বেড়ে ওঠার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এনজে






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














