আফগানিস্তান কাহিনি!

:: সরকার কবির উদ্দিন || প্রকাশ: ২০২১-০৮-১৪ ১২:৫৮:৪৫ || আপডেট: ২০২১-০৮-১৪ ১২:৫৮:৪৫

আমাদের পুরো স্কুল জীবন ১৯৭৯-১৯৮৮ কেটেছে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন এবং সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর শুনে শুনে এবং পড়ে পড়েই। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

স্নায়ুযুদ্ধ কালীন পুরো সোভিয়েত ব্লক এই যুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনী এবং তাদের পুতুল সরকারকে সমর্থন করে। আর আমেরিকা এবং ন্যাটো জোট আফগান মুজাহিদদের সমর্থন করে। মার্কিনীদের দেয়া অস্ত্র এবং অর্থ পেয়েই মুজাহিদদের বিভিন্ন গ্রুপ একত্রিত হয়ে সোভিয়েত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ো গেছে দীর্ঘ এক দশক!

আফগানিস্তানে যুগে যুগে বিভিন্ন বহিঃশক্তি তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে।মহামতি আলেকজান্ডার, সাফাভি বংশ,গজনভী বংশ,ঘুরী বংশ, তৈমুর লংয়ের বংশ,মুঘল বংশ সহ প্রচুর রাজবংশ আফগানিস্তান শাসন করেছে। বাচ্চা ই সাকা নামক এক ডাকাত সর্দার বছরখানেক আফগানিস্তানের আমির ছিলেন। যিনি হাবিবুল্লাহ কালাকানি নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন।

সর্বশেষ বাদশা জহির শাহকে বিতাড়িত করে ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে প্রথম প্রেসিডেন্ট হন জহির শাহেরই চাচাত ভাই ও ভগ্নিপতি জেনারেল দাউদ খান। এরপর বামপন্থী জেনারেল নূরমোহাম্মদ তারাকি দাউদ খানকে অপসারিত করে ক্ষমতায় বসেন। এসময় আফগানিস্তানের দুটো বামপন্থী দল এক হয়ে তারাকিকে উৎখাত করে হাফিজুল্লা আমিনকে ক্ষমতায় বসেন। কিন্তু দল দুটোর কোন্দলে শীঘ্রই সোভিয়েত মদদপুষ্ট বাবরাক কারমাল সরকার ক্ষমতায় আসেন। তার আমলেই কমিউনিস্ট সরকারকে মুজাহিদদের থেকে রক্ষা করতে আফগানিস্তানে ৩০ হাজার সোভিয়েত সৈন্য প্রবেশ করে ১০ বছর দখলদারিত্ব বজায় রাখেন।

১৯৮৯ সালে সর্বশেষ সোভিয়েত বাহিনীর সৈন্যটি ফেরত গেলে মার্কিন মদদপুষ্ট মুজাহিদরা কাবুল দখল করে সোভিয়েত পুতুল সরকারের প্রধান মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহকে হত্যা করে লাশ প্রদর্শনের জন্য রাজপথে ঝুলিয়ে রাখেন। কিন্তু শীঘ্রই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুজাহিদদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে শীর্ষ মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান উদ্দিন রব্বানী, আহমেদ শাহ মাসুদ,গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার প্রমুখের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়।

মুজাহিদদের এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে আফগান পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় নতুন এক মিলিশিয়া বাহিনীর উদ্ভব ঘটে। তাদের নাম তালিবান। তালিবান মানে ছাত্র। মূলত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের দিয়েই এই সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এর নেতৃত্বে আসেন মোল্লা ওমর। সৌদি আরব,আরব আমিরাত ও পাকিস্তান এই তালিবানদের সমর্থন করে। তারা অচিরেই মুজাহিদিন সরকারকে উৎখাত করে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।। আমেরিকা তাদের প্রকাশ্য মদদ দেয়। একসময় ওসামা বিন লাদেন তালিবানের সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। এসময় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারের হামলার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে আমেরিকা। ফলে লাদেন এবং তালিবানকে শায়েস্তা করতে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় আমেরিকা। তারা সফল হয়। উৎখাত হয় তালিবান। নিহত হন মোল্লা ওমর। পরে পাকিস্তানের এবোটাবাদ থেকে লাদেনকে আটক করে হত্যা করা হয়।

এবার আমেরিকার পুতুল সরকারের প্রধান হন হামিদ কারজাই। বছর বিশেক আফগানিস্তানে থেকে বর্তমানে আমেরিকা সৈন্য গুটিয়ে চলে গেছে। এই ফাঁকে আবার তালিবানরা এ পর্যন্ত এক তৃতীয়াংশ প্রদেশ দখল করে নিয়েছে। এখন রাজধানী কাবুলের ৫০ কি.মি দূরত্বে চলে এসেছে তালিবান বাহিনী। যে কোন মূহুর্তে পতন হতে পারে কাবুলের। অবস্থা বেগতিক দেখে বর্তমান আফগান সরকারের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি তালিবানদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

কিন্তু বিজয় উন্মত্ত তালিবান সেই আহবানে থোড়াই পরোয়া করছে। তারা আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসলে আফগানিস্তানের আকাশ আবার ছেয়ে যাবে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও পশ্চাদপদতার অন্ধকারে। মালালা ইউসুফ জাইরা আবারো শিক্ষা বিহীন থাকতে বাধ্য হবেন। আশরাফ গনি সরকারের ভাগ্যে কি আছে আল্লাহ মালুম!

আগামী আফগান দিনগুলো কেমন হবে তা আফগান ক্রিকেটের বিশ্ববিখ্যাত বোলার রশিদ খানের চিন্তাগ্রস্ত মুখাবয়ব এবং বিশ্বনেতাদের প্রতি তার আফগানিস্তান বাঁচানোর আহবান দেখেই স্পষ্ট বুঝা যায়। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে একটি আধুনিক আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠা করবে তালিবানরা এমনটাই আশা এ অঞ্চলের শান্তি প্রিয় মানুষের। যদি এমনটা না হয় তাহলে উপমহাদেশে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তালিবানরা পথের কাঁটা হয়েই থাকবে।

সানবিডি/ এন/আই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •