মাদকের বিরুদ্ধে লড়ছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী— ফেরদৌসী খাতুন

|| প্রকাশ: ২০১৫-১০-১৬ ২৩:৪৯:২৮ || আপডেট: ২০১৫-১০-১৬ ২৩:৫০:২৫

ppppppppppলেখক ঃ মোছাঃ ফেরদৌসী খাতুন, থানা-প্রশিক্ষিকা,
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষাবাহিনী, কোতয়ালি, ঢাকা

মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাস ও অবৈধ পাচার বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ীদের তত্ত্বাবধানে এ দেশীয় কিছু অর্থলোভী মাদক সন্ত্রাসী স্থলসীমা, সমুদ্রপথ, স্থলবন্দর, বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে এদেশে ব্যাপকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ে আসে। ভয়ানক মাদক সন্ত্রাসীরা। যারা মাদক উৎপাদন, চোরাচালান ও বিপণন ইত্যাদি মারাতœক অপরাধ করে থাকে।

এই ভয়ানক মাদক সন্ত্রাসীরা ছিন্নমূল পথশিশু অথবা বস্তির দরিদ্র, অসহায় বিধবা কিংবা স্বামী পরিত্যাক্তা মহিলাদের এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত ভাগ্যাহত অসহায় দরিদ্র ও সমাজিক বঞ্চনার শিকার শিশুদের প্রতি অল্প পারিশ্রমিক ক্ষেত্র বিশেষ শুধুমাত্র অতি সামান্য খাদ্যের বিনিময়ে, সারাদিন মাদকের কেনা-বেচার কাজে নিয়োজিত করছে। এসব নারী-শিশু মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেরাও একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে এবং এদের অনেকেই পরবর্তীতে মাদক সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়।

সঠিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও সাধারণ ভাবে বলা যায়, বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের মাদকাসক্ত সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। কোন হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ। তন্মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ পুরুষ ও অবশিষ্ট নারী। উপরের এই মাদকাসক্ত জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯০ ভাগ তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স ১৮-২৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে মাদকাসক্তের হার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি। যার উদাহরণ এদেশের খ্যাতিমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। মাদকাশক্তি সম্পর্কিত এ তথ্য সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক এবং সরকারে ভিষন-২০২১ বাস্তবায়নে একটি সম্ভাব্য অন্তরায়।
মাদকাশক্তির সঠিক কারন নির্ণয় করা কষ্টকর। তবে নি¤œবর্ণিত কারনগুলোকে তরুণ-তরুণীদের আশক্তির দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারেঃ আতœমর্যাদাবোধের সল্পতা ও আতœভাবমূর্র্তির অস্পষ্টতা। জীবনের বিভিন্ন ধরনের চাপ মোকাবেলায় অক্ষমতা। বন্ধুরা মাদক গ্রহন করে বলে এবং ঐ গুরুপের অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য অনেক তরুণ-তরুণী মাদক গ্রহন করে। চেখে দেখা ও কৌতুকবসত, রঙ্গ-তামাশা করার জন্য। পিতা-মাতা কর্তৃক প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ, তালাক, বিচ্ছেদ, আবেগের অতিরিক্ত বহিঃপ্রকাশ। মাদকের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, সমাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়া। আসক্তি সৃষ্টি করে এমন মাদকের খারাপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারনার অভাব।
আপনার সন্তান যদি হঠাৎ করে নতুন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চলাফেরা আরম্ভ করে। বিভিন্ন অজুহাতে ঘন ঘন টাকা চায়। দিনে ঘুম এবং রাতে জাগার স্বভাব প্রদর্শন করে। ক্রমান্বয়ে বিলম্বে বাড়িতে ফেরৎ আসে। সবসময় ঘুম থেকে জাগার পড়ে অস্বাভাবিক আচরন করে। খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয় এবং ওজন কমতে থাকে। অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টি খেতে আরম্ভ করে। দীর্ঘ সময় টয়লেটে কাটায়। কোষ্ঠ-কাঠিন্যে ভোগে। অকারনে বিরক্ত হতে আরম্ভ করে। তার রুমে যদি তামাক, ছোট প্লাষ্টিকের বোতল, খালি শিষি, পোড়ানো দিয়াশলাই এর কাঠি ইত্যাদি পাওয়া যায়। তাহলে আপনার সন্তান মাদকাসক্ত একথা সন্দেহ করা যায়।

মাদক একটি ঘাতক ও বহুমাত্রিক জটিল সামাজিক সমস্যা। নারী নির্যাতন এবং ইভটিজিং এ দুটোর মূল কারন হল এই মাদকদ্রব্য। বখে যাওয়া যে সকল তরুণ-যুবক নারী নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মত জঘন্ন কাজ করে তারা মূলত অধিকাংশ মাদকসেবি। বিধায় মাদকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রন করতে পারলে নারী নির্যাতন এবং যৌন হয়রানী (ইভটিজিং) অনেকাংশে কমে আসবে।

কোন একক সংস্থা দ্বারা মাদক সমস্যার মোকাবেলা করা দুঃরুহ কাজ। অবৈধ মাদক চোরাচালান বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা হ্রাস তথা মাদক সেবনে নিরুৎসাহিত করা একান্ত আবশ্যক। এই উপলব্ধি থেকে মাদক বিরোধী গণ সচেতনতা সৃষ্টি কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়া আজ সময়ের দাবি। কোন বিষয়ে যৌন সচেতনতা তৈরি করার প্রথম ধাপ হচ্ছে জনগনের মাঝে তথ্য পৌছে দেয়া। এ লক্ষে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদ ১৯৮৭ সালে ২৬ শে জুনকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষনা করেছে। এই জনসচেতনতার জন্য বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি অন্যন্য অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি সচেতন ও সুশৃঙ্খল অংশ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি তৃণমূল সংগঠন। এসংগঠন ১৯৪৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারীতে গঠিত হয় এবং ১৯৭৬ সালের ৫ই জানুয়ারী বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইল ফলক হিসেবে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী আতœপ্রকাশ করে। ১৯৯৫ সালের ৩নং এবং ৫নং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধীনে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সদর দপ্তর দ্বারা পরিচালিত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৫২ এ প্রদত্ত শৃঙ্খলা বাহিনী সংজ্ঞার অর্থে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি শৃঙ্খলা বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। প্রতিটি ইউনিয়ন/ওয়ার্ডে এ বাহিনীর ৩২ জনের একটি ভিডিপি পুরুষ প্লাটুন এবং ৩২ জনের একটি ভিডিপি মহিলা প্লাটুন বিদ্যমান। প্রতিটি ইউনিয়নে ৩২ জন পুরুষ আনসার প্লাটুন এবং প্রতিটি উপজেলা/থানায় ১০০ জন পুরুষের একটি আনসার কোম্পানি ও ৩২ জন মহিলার একটি মহিলা আনসার প্লাটুন আছে। এরা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে মাটি ও মানুষের মাঝে প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এরা প্রায় সবাই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এরা নিজ নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উন্নয়ন ও উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আনসার ভিডিপি মৌলিক প্রশিক্ষণ, সতেজকরণ প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধ এবং মাদকের সেবনের কুফল সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করে প্রশিক্ষনার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য/সদস্যগণ মাদকদ্রব্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে ও দেশের মাঠ পর্যায়ে প্রতিটি শহর, গ্রামে, মহল্লায় মাদক বিরোধী প্রচারণা ও উদ্ভূদ্ধকরনের ক্ষেত্রে সুদূঢ় প্রসারী গুরুপ্তপূর্ণ অবদান রাখতে পারে মর্মে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আনসার ভিডিপি সদস্যরা মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে এবং মাদকাশক্তি মুক্ত মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ভিষন ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় বলিষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আনসার ভিডিপি সংগঠনের কোন বিকল্প নেই।