বাংলাদেশের ঋণমান নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করেছে মুডি’স
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৯-১৫ ২২:০৬:০৪
- রাজনৈতিক ও বাহ্যিক চাপ কমায় ঋণমানে উন্নতি
- রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে শক্তিশালী হয়েছে অর্থনীতি
- প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হবে ধীরগতিতে
- ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৩% হতে পারে
- ব্যাংকিং খাত এখনো প্রধান দুর্বলতা
বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেগেটিভ’ বা ঋণাত্মক থেকে বাড়িয়ে ইতিবাচক বা স্থিতিশীল করেছে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা– মুডি’স রেটিং। রাজনৈতিক ও বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস পাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গতি ফেরা এবং রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতায় ঋণমানের এই ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক এই ঋণমান যাচাইকারী সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ‘ইস্যুয়ার’ এবং ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিংকে– বি২ এবং স্বল্পমেয়াদী ইস্যুয়ার রেটিং নট প্রাইম- এ অপরিবর্তিত রেখেছে।
মুডি’স জানিয়েছে, যেসব ঝুঁকির কারণে আগে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক বা ঋণাত্মক করা হয়েছিল, বি২ রেটিং পর্যায়ে তা এখন অনেকটাই সুষম বা ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নতুন সরকারের পক্ষে শক্তিশালী গণরায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার বর্ধিত রিজার্ভ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্সের সহায়তায় দেশের বাহ্যিক অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে, যা বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে সাহায্য করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা বাহ্যিক বা বিদেশি অর্থায়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আইএমএফের পরবর্তী ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলী নিয়ে এখনও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে ঋণদাতাটির।
রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধার হবে ধীরগতির
২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে। এটি দিয়ে চার মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
এই পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং বাজারে পূর্বে বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মুডি’স।
সংস্থাটি আশা করছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪.৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিনিয়োগ ও শিল্প কারখানার কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ৪.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
তবে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসার আগে ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত এখনো প্রধান দুর্বলতা
সার্বিক পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি, ঋণ পরিশোধের দুর্বল সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের চরম ভঙ্গুরতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের মূল ঋণমান ‘বি২’-তেই বহাল রেখেছে মুডি’স।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংস্কারের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩২.৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে— জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ মূলধন পুনর্গঠন (রিক্যাপিটালাইজেশন) বাবদ জোগান দেওয়ার প্রয়োজন হবে।
মুডি’স-এর মতে, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে – মূলধন পুনর্গঠনের এই বিশাল চাহিদা সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা তারল্য সংকট নয়, বরং সচ্ছলতা ও মূলধনের অভাব।
সংকীর্ণ রাজস্ব ভিত্তি বাড়াচ্ছে চাপ
মুডি’স উল্লেখ করেছে, তাঁরা যেসব দেশের ঋণমান নির্ধারণ করে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের ভিত্তি অন্যতম সংকীর্ণ, যা সরকারের রাজস্ব সংক্রান্ত নমনীয়তাকে সংকুচিত করে রাখছে। মোট সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও— অর্জিত সরকারি রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনার কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারের সার্বিক ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এছাড়া চলতি অর্থবছরের ঘাটতির সঙ্গে বিগত সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের মাঝে ঘাটতি (প্রাইমারি ডেফিসিট) অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত খরচের কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারের সার্বিক ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অবশ্য নমনীয় বা সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা অব্যাহত থাকলে তা সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও এলডিসি উত্তরণ বড় ঝুঁকি
মুডি’স- এর মতে, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একটি এলএনজি আমদানি টার্মিনালে দুর্ঘটনার ফলে, এলএনজি আমদানিতে ঘটার ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়। যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা ও সার উৎপাদনে চরম গ্যাস সংকট দেখা দেয়।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, আগামী বছরগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটলে তা দেশের রপ্তানি সক্ষমতা এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের কারণে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত রপ্তানির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বহাল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে।
ঋণমানের ইতিবাচক বা নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে যেভাবে
মুডি’স জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কার্যকারিতার উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশের ঋণমান আরও উন্নত (আপগ্রেড) হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের বিশাল দায়ভার সরকারের বাজেটের ওপর এসে পড়া, প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব পরিস্থিতিতে নতুন বিপর্যয়, বৈদেশিক অর্থায়নের পথ সংকুচিত হওয়া কিংবা পুনরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে—বাংলাদেশের ঋণমান আবারও নামিয়ে দেওয়ার (ডাউনগ্রেড) চাপ তৈরি হতে পারে।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














