সিপিডি চেয়ারম্যান
বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-১০-০৩ ২০:০১:৪৫
বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন ঠেকাতে উন্নত দেশগুলো বাজারে হস্তক্ষেপ ও শুল্কের মতো যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধান কাজ বিশ্বজুড়ে নিজের মূল্যশৃঙ্খল (ভ্যালু চেইন) শক্তিশালী করা এবং চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগানো।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দীর্ঘ সময় পর একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে, যার মূল বৈশিষ্ট্য এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের স্থানান্তর। পণ্য বাণিজ্যে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার কারণে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত জমেছে।
তিনি বলেন, মূলধনের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় সহায়তা বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) জন্য এখন আর শুধু পশ্চিমের ওপর নির্ভর করতে হয় না, বিকল্প উৎস তৈরি হয়েছে। এতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কম আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থা গড়ার সুযোগ এসেছে। অতীতে উত্তর থেকে দক্ষিণে, অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সম্পদ প্রবাহিত হওয়ার সময় নীতি ও কৌশলগত বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতো। এশিয়াকে কেন্দ্র করে বিকল্প অর্থনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠায় এখন তা আগের মতো সম্ভব নয়।
বাণিজ্যের চিত্রও বদলেছে বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, আগে এশিয়ার অধিকাংশ দেশের বাণিজ্য পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তেল রপ্তানিকারক পশ্চিম এশীয় দেশসহ প্রায় সব এশীয় দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এশিয়ার মধ্যেই। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারও এখন পশ্চিমে নয়। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে ৭০টির প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পেটেন্ট এবং গবেষণাপত্র প্রকাশ—দুই ক্ষেত্রেই চীন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে মূলধন স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীও এখন চীন; সহায়তা, ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিটে এই অবস্থান আগে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের।
সিপিডি চেয়ারম্যান বলেন, এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে আরও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এতদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য করা উন্নত দেশগুলো এই পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে। তবে তারা নতুন শক্তিগুলোর বাজারে প্রতিযোগিতা করে নয়, হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তা করছে। এতে বাণিজ্যব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বাড়ছে এবং উপনিবেশিক বাণিজ্য মডেলেরও প্রত্যাবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা শক্তিগুলো সামরিক বিজয় ও উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বাজার তৈরি করেছিল এবং বিভিন্ন দেশের সম্পদের ওপর অসম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর বিপরীতে আজকের ক্ষমতার স্থানান্তর মূলত বাজারের ভেতরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঘটেছে, যা বেশ ব্যতিক্রমী। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে উপস্থিতি বাড়িয়েছে মূলত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জোরে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘অর্থনীতির অস্ত্রীকরণ’ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কিছু ইউরোপীয় দেশ নিজেদের বাজারকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে ও প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। শুল্কের চাপে অনেক দেশকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে এবং যুক্তরাষ্ট্রেই বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বা অর্থনৈতিক যুক্তির ভিত্তিতে ঘটছে না। ব্রাজিল, কানাডা, চীন, এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ভারতের ওপরও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এসবই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক চাপ ও শুল্ক ব্যবস্থার ব্যবহার।
এই পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থের দিক থেকেও টেকসই নয় বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, কোনো দেশকে নিজের বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ দিতে বা নিজের পণ্য কিনতে বাধ্য করতে হলে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে সেই পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। স্বাভাবিক বাজারে ক্রেতারা নিজেরাই যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে পণ্য কিনতে উৎসাহিত হওয়ার কথা।
উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ম্যাককিনলির সুরক্ষাবাদী নীতির মতো বাজার সুরক্ষিত করে ক্ষয়িষ্ণু শিল্পভিত্তি পুনরুজ্জীবনের ধারণাও বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি। এর পাশাপাশি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমাগত আক্রমণ ও ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনেকটাই প্রান্তিক হয়ে পড়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠিত অনেক নিয়ম নিয়মিত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তবে এসব পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া থামাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার মতে, এশিয়া ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। চীন ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) হিসাবে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে এবং নামমাত্র জিডিপির হিসাবেও ভবিষ্যতে ছাড়িয়ে যাবে। চীন এশিয়ার জন্য মূলধন রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠবে।
বিশৃঙ্খলার প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পড়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধ, সেখানকার অস্থিরতা ও বিভিন্ন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
আগের আলোচনায় বাংলাদেশকে কৌশলগত খেলোয়াড় হিসেবে দেখার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার সক্ষমতা। দেশকে ছোট খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হলেও এটি বাংলাদেশকে নমনীয়তা দেয়। বাংলাদেশের স্বার্থ এমন স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে বাইরের শক্তিগুলো এসে সুযোগ বাধাগ্রস্ত করবে না।
তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিশ্বজুড়ে মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করা। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার অত্যন্ত সীমিত, অথচ প্রধান আমদানি উৎস এবং ক্রমবর্ধমানভাবে মূলধনের উৎসও এশিয়া। তাই দেশের মূল্যশৃঙ্খলকে এশিয়ায় তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় সম্পদ চীন ও ভারতের মতো দুই বড় অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিবেশী হওয়া- উল্লেখ করে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আরও এক দশক পর চীন বিশ্বের বৃহত্তম এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে। কিন্তু এই সুযোগ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এসব দেশের মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা যুক্ত হলেও সেখানে নতুন তৈরি হওয়া রপ্তানি সুযোগের সঙ্গে দেশের রপ্তানি যথেষ্টভাবে যুক্ত হয়নি। ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনায় বাংলাদেশ খুব কার্যকর নয়, আর তা বাস্তবায়নে আরও দুর্বল। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার বিষয়ে কাগজে-কলমে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও চিন্তার প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা দুর্বল রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব তার অর্থনৈতিক অবস্থানে এবং তা শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, স্থলভাগেও নিহিত বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, পদ্মা ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও শেষ পর্যন্ত ইউরোপের মধ্যে স্থলসংযোগের সুযোগ তৈরি করছে। এই সংযোগ গড়ার একটি উদ্যোগ ছিল বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) উদ্যোগ। তিনি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন বলেও জানান।
এশিয়ার ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে তিনি ভারত ও চীনের মধ্যকার এখনো অস্বস্তিকর সম্পর্কের কথা বলেন। চীন ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী। তারপরও হিমালয়ের একটি সংকীর্ণ সীমান্ত নিয়ে বিরোধ চলতে থাকাকে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য বলে মনে করেন।
তার মতে, চীন-ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল হলে এবং এতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারলে, তা বৈশ্বিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এই অংশীদারত্ব আরও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করবে এবং বিশ্বব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে।
বিএইচ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














