কয়রায় বাড়ছে ডেঙ্গু, সেবাসংকটে উপকূলের হাসপাতাল
জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২৬-০৯-২২ ০৯:৫৫:২২
খুলনার সুন্দরবনবেষ্টিত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২০ দিনেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী। কিন্তু মূল ভবন নির্মাণকাজ থমকে থাকায় এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্যাথলজিস্ট না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। কিট ও ওষুধ থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে পরীক্ষা করানো এবং ওষুধ কেনার বাধ্যবাধকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলের দিনমজুর ও সাধারণ মানুষ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনে ভর্তি হওয়া ৩৮ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৩০ জন পুরুষ, আটজন নারী এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী দুটি শিশু রয়েছে। এর আগে গত আগস্ট মাসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ১৯ জন। হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগেও প্রতিদিন ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে সেবা নিচ্ছেন বহু মানুষ।
সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হাসপাতালে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় চিকিৎসাসেবার নানামুখী অব্যবস্থাপনা ও সংকটের চিত্র। কালনা গ্রাম থেকে আসা মাসুরা বেগম জানান, তাঁর সাড়ে চার বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে দুদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শিশুটির শরীরে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর ও ডায়রিয়ার উপসর্গ রয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতালে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই, তাই ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছি না। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বাইরের ক্লিনিক থেকে করাতে হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যায় পশ্চিম দেয়াড়া গ্রাম থেকে আসা ১৬ বছরের কিশোর সোহেলের ক্ষেত্রেও। সোহেলের পিতা বাহের মোল্লা বলেন, আমি খুব গরিব মানুষ, খরচ কম হবে ভেবে ছেলেকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু টেস্ট, ইনজেকশন ও স্যালাইন—সবই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস১ (NS1) কিট পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. আবির হোসেন রোগীদের বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে ডেঙ্গু টেস্টের জন্য পাঠাচ্ছেন। এছাড়া প্যাথলজিস্ট না থাকার দোহাই দিয়ে অন্যান্য প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষাও বাধ্য হয়ে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে হচ্ছে রোগীদের।
চিকিৎসা খরচের পাশাপাশি হাসপাতালে যুক্ত হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সংকট। চিকিৎসাধীন মদিনাবাদ গ্রামের আশরাফুল বলেন, পাঁচ দিন ধরে জ্বরে ভুগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বোতলজাত পানিও বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। তীব্র গরম আর প্লাটিলেট কমে যাওয়ার যন্ত্রণায় অবস্থা করুণ।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকা ও খুলনাসহ বিভিন্ন শহর থেকে আসা মানুষের পাশাপাশি কয়রার স্থানীয় বাসিন্দারাও ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের ইংরেজি প্রভাষক রেজওয়ান জানান, তাঁর ছেলের জ্বর হলে স্থানীয় ক্লিনিকে পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে ডেঙ্গু নেগেটিভ আসলেও শিশুটির প্লাটিলেট আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩১ শয্যার মূল ভবন নির্মাণের কাজ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার পর পুনরায় টেন্ডার হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। ফলে মাত্র ১৯ শয্যার ছোট ভবনে বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সার্বিক বিষয়ে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। বিনামূল্যে পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত NS1 টেস্ট কিট ও আইভি স্যালাইন মজুদ রয়েছে এবং সব রোগীকে মশারি দেওয়া হয়েছে।
তবে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ৩১ শয্যার ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার পর পুনরায় টেন্ডার হয়েছে, কিন্তু এখনো কাজ শুরু না হওয়ায় ১৯ শয্যার ভবনে সার্বিক কার্যক্রম চালাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে প্যাথলজিস্ট না থাকায় বাধ্য হয়েই রোগীদের বাইরের ক্লিনিক থেকে অন্যান্য পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
এনজে






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














