নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়াল, নিখোঁজ প্রায় ১৫০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশ: ২০২৬-০৮-২৭ ১৪:৩৯:০৩


হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে ৭০০ জনের বেশি বিভিন্ন দেশের নাগরিক বলে জানা গেছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবারও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয়ের একটি নদীতে পাহাড়ের বিশাল অংশ থেকে কাদা ও পাথরের দেয়ালধস নেমে আসার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী জনপদ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসাকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আশপাশের এলাকা। ওই পথে বহু ট্রেকার ও কৈলাস-মানসসরোবরগামী তীর্থযাত্রী অবস্থান করায় নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্যার পর বহু শহর ও উপত্যকা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

নেপাল পুলিশের হিসাবে দেশটিতে এখনো ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৭ জন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন নাগরিক রয়েছেন।

অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজদের তালিকায় কোনো ব্যক্তির নাম একাধিকবার রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

হেলিকপ্টারে চলছে উদ্ধার অভিযান

দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন উদ্ধারকর্মীরা। একই সঙ্গে আটকে পড়া মানুষের কাছে তাঁবু, খাবার ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাঁচ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ২০ জন বিদেশিসহ ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান পুনরায় শুরু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সেখানে গেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসের শক্তিতে সৃষ্টি কম্পন?

দুর্যোগের শুরুতে নেপালি কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত ওই কম্পন আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন শক্তি হতে পারে। এরপরই ধ্বংসাবশেষ বহনকারী প্রবল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে।

চীনা কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, গিরং এলাকায় ভূমিধস ও বন্যাকবলিত সীমান্তের উজানে এখনো একটি বাঁধসদৃশ অবরুদ্ধ হ্রদ রয়েছে। সামনে বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় এটি নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তীর্থযাত্রায় গিয়েই নিখোঁজ অনেকে

নিখোঁজ ও নিহতদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে উচ্চ পার্বত্য এ অঞ্চলটি পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত।

দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে ৫ লাখ ডলারের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক উপদেষ্টা পাঠানোর কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘও দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জনবল পাঠাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স