চট্টগ্রামের বাজারে কমেনি নিত্যপণ্যের দাম, দিশেহারা ক্রেতা

জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২৬-১০-০২ ১৫:০৭:৪৩


‘আগে যা কিনতাম, এখন তার অর্ধেক কিনি’ –বাজারে এমন আক্ষেপই এখন সাধারণ ক্রেতাদের মুখে মুখে। আয় বাড়েনি অথচ চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম থেকে শুরু করে মুদি পণ্যের খরচ বাড়ছেই।

এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা।

গেলো এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি। মাছ, মাংস, ডিম, মুরগি, সবজি, ভোজ্যতেল, মসলা কিংবা মুদিপণ্যসহ প্রায় সবকিছুর দামই অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে বাজারে আসা নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ বিক্রেতার দিকে, বিক্রেতারা দায় দিচ্ছেন আড়তদারদের। আর আড়তদারদের দাবি, আমদানি, সরবরাহ ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই পণ্যের দর চড়া।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীর রেয়াজউদ্দিন ও কাজীর দেউরি বাজারে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং দাম অপরিবর্তিত থাকায় ক্রেতাদের ওপর চাপ বেড়েছে। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও কেনাকাটার পরিমাণে তার প্রভাব স্পষ্ট।

দেখা যায়, সবজির মধ্যে গাজর ১শ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, শিম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১শ টাকা, ফুলকপি ৬০ টাকা, বাধাকপি ৮০ টাকা, ঝিঙে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, তিতা করলা ৮০ থেকে ১শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। হিসেবে সপ্তাহের ব্যবধানে টমেটো ২০ টাকা, শিম ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। এছাড়া অনান্য সবজির দরও রয়েছে অপরিবর্তিত।

মো. নাসির নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা যাচ্ছে না। এক দুই কেজি করে কিনতে গেলেও মোট খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছে আড়তদারেরা দাম বাড়াচ্ছে।’

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। রুই ও কাতলা আকারভেদে প্রায় ৩শ থেকে ৪৩০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২শ থেকে ২৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩শ টাকা, লইট্টা ২শ থেকে ২৫০ টাকা, কোরাল ৬৫০ থেকে ১ হাজার টাকা, বাইম ৬শ থেকে ৮শ টাকা এবং দেশি কই ৭শ থেকে ৮শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। ইলিশের দাম আকারভেদে ৮শ টাকা থেকে ১৮শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যায়।

মাংসের বাজারে গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮শ টাকা এবং হাড়ছাড়া গরুর মাংস ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। খাসির মাংসও ক্রেতাদের জন্য ব্যয়বহুল। কেজি প্রতি খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে ১২শ টাকা।

মুরগির বাজারে ব্রয়লার ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা, সোনালি প্রায় ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬শ থেকে ৮শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

বাড়তে থাকা বাজারে ডিমের দামেও আসেনি কোন পরিবর্তন। বাজারে ফার্মের লাল ডিম ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা, সাদা ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা।

কাজীর দেউরি বাজারে ক্রেতা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বাজারের অবস্থা এমন হয়েছে যে প্রয়োজন আর সাধ্যের মধ্যে মিল নেই। মাছের দাম বেশি, মাংসের দাম বেশি, সবজির দামও কম নয়। ডিম কিনে কোনোভাবে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করি, সেখানেও দাম বাড়ে।’

ক্রেতা মো. শামীম বলেন, ‘বাজারে এসে আগে যে পরিমাণ মাছ-মাংস, সবজি ও মুদি পণ্য কিনতাম এখন তা পারছি না। দাম কমার কথা শুনলেও বাজারে এসে তার কোনো প্রভাব দেখি না। বাজার তদারকির কোনো খবর শুনিনা।’

ক্রেতাদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুরগি বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। পোল্ট্রি খামারিদের থেকে যে দামে কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন ও দোকানের খরচ যোগ করে বিক্রি করতে হয়। আগের দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে।’

মুদি ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, ‘ক্রেতারা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। কিন্তু আমরা যে দামে পণ্য কিনছি, সেই দরের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আড়তে দাম বেশি থাকলে খুচরায়ও দাম কমানো কঠিন।’ ডালের পাইকারি বাজারেও চাহিদা কমেছে। বকসিরহাটে ভারতীয় চিকন মসুর ডাল কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, মোটা মসুর ৯০ থেকে ১১০ টাকা, মুগডাল ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, চনার ডাল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা এবং মটর ডাল ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া অনান্য মুদিপণ্যের মধ্যে চাল, চিনি, আটা, ময়দা, ছোলা, লবণ, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দরে বাজারভেদে পার্থক্য রয়েছে।

বাজারে সরু আমন চাল ৭২ থেকে ৭৫ টাকা, মাঝারি ৫৬ থেকে ৬০ টাকা, মোটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেটজাত আটা ৫৮ থেকে ৬১ টাকা, চিনি ১৩২ থেকে ১৩৫ টাকা, ছোলা ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং মুগডাল ১২২ থেকে ১২৮ টাকা কেজি দওে বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া পচনশীল মসলার মধ্যে পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, রসুন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা এবং আদা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দওে বিক্রি হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমদানি পর্যায়ে পণ্যের দাম, জাহাজীকরণ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের ভেতরে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এসব ব্যয় যোগ হয়ে পাইকারি বাজারে চাপ তৈরি করছে। তবে কোনো কোনো পণ্যে পাইকারি দর কমতেও শুরু করেছে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পরিবহন বা আমদানি ব্যয় বাড়ার বাস্তব প্রভাব থাকলে তার হিসাব বাজারদরেও প্রতিফলিত হতে পারে। কিন্তু সেই অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রকৃত ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন। বাজারে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

নাজের হোসাইন আরও বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। তাই শুধু বাজারে অভিযান চালালেই হবে না, কোন পর্যায়ে কতটা মূল্য বাড়ছে সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি খুচরা পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়, তাহলে তার কারণ খুঁজে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে বাজারে তদারকি কার্যক্রম নিয়মিত চলছে এবং অনিয়ম পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা রাখা, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রির বিষয়গুলোও দেখা হচ্ছে।’

এনজে