প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

থাই বিনিয়োগ টানতে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদন নেটওয়ার্কে জোর

::গিয়াস উদ্দিন, ব্যাংকক থেকে আপডেট: ২০২৬-১০-১২ ১৬:২১:৫২


থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ আকর্ষণে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং দুই দেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এসব খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে থাই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাড়ানো।

সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় সম্ভাবনা

থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে।

বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল, লিচু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এতে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। এসব পণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল খাদ্যপণ্য হিসেবে রপ্তানির বিষয়ে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ধরনের বিনিয়োগ রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, অপচয় কমানো এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

দুই দেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হবে।

আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডে প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে।

এ ধরনের উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে দুই দেশের শিল্পপ্রততিষ্ঠানগুলো পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারবে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণও বাড়বে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পায়ন, মূল্য সংযোজন ও যৌথ উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এর ফলে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রেনং-চট্টগ্রাম সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, দুই বন্দরের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো এবং পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল করা গেলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক সহজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা

থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, শুল্কসুবিধা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব। তবে সরকারের লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ

থাইল্যান্ডের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগ উদ্যোগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল এবং প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।

তিনি জানান, বন্ধ কলকারখানা চালুর ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি তিনি তুলে ধরেননি।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্য অর্জনে থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিএইচ