অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ সরকারের

::গিয়াস উদ্দিন, ব্যাংকক থেকে প্রকাশ: ২০২৬-১০-১২ ১৬:৩২:২৮


অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে। সংস্কারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারে এই সমন্বয় কর্মসূচি বাস্তবায়নকে সহজ করবে বলে মনে করছে সরকার।

সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সংস্কারে গুরুত্ব আর্থিক শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থানে

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের জন্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায়ের হার বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শের সমন্বয় করা হচ্ছে।

তার মতে, সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারের হাতেই থাকবে। রাজনৈতিক সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। এতে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি।

জ্বালানি ব্যয় সামাল ও সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেনি। এ কারণে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়ার বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

এদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে পরিবার কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে পুনঃঅর্থায়নের উদ্যোগ

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, অতীতের অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার প্রভাব এখনো অর্থনীতিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক খাতে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন বিনিয়োগে প্রণোদনা

বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ঋণাত্মক সুদে সাত শতাংশ অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, দেশে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয়েও অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। এ ব্যবস্থায় কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদন, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা যেতে পারে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানো, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতির পুনর্গঠনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগসহ বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফর করেছে। পাশাপাশি সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ এগিয়ে নিতে চায় সরকার।

উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা

বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে সরকার।

বিএইচ