আইএমএফের বার্ষিক সভা শুরু
জ্বালানি সংকট, ঋণের চাপ নিয়ে আলোচনা; সংস্কার ও আর্থিক সহায়তায় নজর বাংলাদেশের
::গিয়াস উদ্দিন, ব্যাংকক থেকে আপডেট: ২০২৬-১০-১২ ১৮:২১:৩৮
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসারের প্রভাব মোকাবিলায় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা শুরু হয়েছে । বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা মোকাবিলা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকট নিরসন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ নির্ধারণে এবারের সভাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এআইনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট ও ঋণের চাপে বিশ্ব অর্থনীতি
এবারের সভার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন, উৎপাদন, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো এ সংকটে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের দায় সামলাতে গিয়ে এসব দেশের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ দেশগুলোকে সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অকার্যকর ভর্তুকি কমানো এবং আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩০ থেকে ৪০টি দেশের জন্য জরুরি সহায়তার উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার বিষয়টি এবারের সভায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার ভাষ্য অনুযায়ী, তীব্র অর্থনৈতিক চাপে থাকা ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সংকটকালীন সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের চাপ কমাতে ‘ডেট-ফর-ডেভেলপমেন্ট সোয়াপ’ বা উন্নয়নের বিনিময়ে ঋণ পুনর্বিন্যাস এবং বিশেষ আর্থিক গ্যারান্টির মতো উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে ঋণ পরিশোধের চাপ সামলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সতর্ক করেছে, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ একাধিক অর্থনৈতিক ধাক্কা উন্নয়নশীল দেশগুলোর লাখ লাখ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই জরুরি তারল্য সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
এআইয়ের প্রসার ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
জ্বালানি সংকট ও ঋণের চাপের পাশাপাশি এবারের সভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনৈতিক প্রভাবও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ শেয়ারবাজার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে প্রযুক্তির সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যমান কাজের মান উন্নয়নের সম্ভাবনা গুরুত্ব পেয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এআইয়ের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ঘাটতি থাকলে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এআইনির্ভর অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে যথাযথ নীতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এআই নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তেমাসেক ট্রাস্টের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অংশীদারত্ব
উন্নয়ন অর্থায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহযোগিতা বাড়াতে সভার সাইডলাইনে সিঙ্গাপুরের তেমাসেক ট্রাস্ট এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মধ্যে কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ অংশীদারত্বের লক্ষ্য যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক অর্থায়ন ও সামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এবারের সভা
বিশ্ব অর্থনীতির এ অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের জন্যও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচি ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
সম্প্রতি খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদনের বিষয়টিও উন্নয়ন অর্থায়নের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে শুধু ঋণ সহায়তা নয়, রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সামনে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত
এবারের বার্ষিক সভায় বিশ্ব অর্থনীতির সামনে থাকা তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—জ্বালানি সংকট, ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং এআইয়ের দ্রুত বিস্তার—বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং উন্নয়ন ব্যয় বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে নীতিনির্ধারকদের।
একই সঙ্গে এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথও খুঁজতে হবে। ফলে ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এ সভা কেবল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার আয়োজন নয়; বরং সংকট মোকাবিলা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
বাংলাদেশের জন্যও এ সভার গুরুত্ব অনেক। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএইচ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












