বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রস্তাব

::গিয়াস উদ্দিন, ব্যাংকক থেকে আপডেট: ২০২৬-১০-১২ ১৮:২৫:১৪


কাঠামোগত অসংগতি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনিরাপদ ঋণ ও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে রাখছে। এই গভীর অর্থনৈতিক ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার হওয়া এবং টেকসই সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর রেয়াতি ঋণব্যবস্থায় ঋণের মেয়াদ ও সুদের হার আরও সুবিন্যস্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা সব দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, যেমন ৪০ বছর মেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘১৭তম ভি-২০ মিনিস্টারিয়াল কমিউনিক’ থেকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। সভায় ৭৭টি দেশের অর্থমন্ত্রীরা সরাসরি ও অনলাইনে অংশ নিয়ে এসব দাবি তুলে ধরেন। সভায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও অংশ নেন।

ভি-২০ মিনিস্ট্রিয়াল গ্রুপ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরাম। ২০১৫ সালে গঠিত এই জোটের প্রধান লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা। পেরুর লিমায় যাত্রা শুরু করা এ জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিল ২০টি দেশ। পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে এর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ জোটটির অন্যতম সক্রিয় ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য।

১৭তম ভি-২০ মিনিস্টারিয়াল কমিউনিক প্রতিবেদনে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত কাঠামোর ত্রুটি তুলে ধরে এর নৈতিক দিকটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু ও উন্নয়নসংকট কেবল আর্থিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন। পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো ও সম্পদ ৫০ থেকে ১০০ বছর ধরে অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারে। অথচ বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এসব খাতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়। এ ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে ৪০ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভি-২০ভুক্ত দেশগুলো প্রায় ১৯০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের অংশীদার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধীরগতি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ঘাটতি এসব দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা অসম উন্নয়নকে আরও তীব্র করেছে।

প্রচলিত উন্নয়ন অর্থায়নব্যবস্থা উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণমূলক সম্পদের বিপরীতে ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি অর্থায়ন এবং ঋণ পরিশোধে উচ্চ ব্যয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভি-২০ভুক্ত পাঁচটি দেশ চরম ঋণসংকটে রয়েছে, ১৭টি দেশ উচ্চ ঝুঁকিতে এবং ২২টি দেশ মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্ধেকের বেশি সদস্যদেশ তাদের সরকারি রাজস্বের ১০ থেকে ২০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করে। প্রায় এক ডজন দেশ অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধেই রাজস্বের এক-পঞ্চমাংশের বেশি ব্যয় করছে।

প্রতিবেদনে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও খাদ্য সরবরাহ খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন সংকট ও আকস্মিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএইচ