মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য দশটি কৌশলগত দরজা

সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৬-০৯-০৬ ২১:৪১:০২


মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কিনা, প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি প্রতিরক্ষা জোটে অংশ নেওয়ার প্রশ্ন। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে থাকা একটি রাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ আরও গভীর। আসল প্রশ্ন হলো, এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো কি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ, কূটনৈতিক পরিসর এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে পারবে?

৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ঘোষিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটির ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী করা হবে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকে এই সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার সিদ্ধান্ত হয়। সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখনই কোনো চূড়ান্ত যোগদানের সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি সম্ভাব্য কৌশলগত পথের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমার মতে, এই পথ বন্ধ না করে এর সম্ভাবনাগুলো জাতীয় স্বার্থের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষা করা উচিত।

১. নিরাপত্তায় বিকল্প

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখে। তাই মক্কা চুক্তির মূল্য একক নিরাপত্তা-নির্ভরতা ভাঙায় নয়, বরং নিরাপত্তায় আরও কার্যকর বিকল্প তৈরিতে। আধুনিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, সামরিক শিক্ষা, তথ্য বিনিময়, গবেষণা এবং নীতি-সমন্বয়ও এর অংশ। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে কিনের (২০১৮) গবেষণা দেখায়, এ ধরনের সম্পর্ক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য প্রথম দরজা হলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা-পরিসর বাড়ানো, কোনো বিদ্যমান অংশীদারকে বাদ দেওয়া নয়। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সম্পদে নয়, সংকটের সময় তার সামনে কতগুলো কার্যকর বিকল্প থাকে, তার ওপরও নির্ভর করে।

২. প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার একটি হতে পারে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা। ৩১ আগস্টের বৈঠকে তিন দেশ যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনের কথা বলেছে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হওয়া উচিত শুধু নতুন অস্ত্র কেনা নয়, বরং প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তি আত্মস্থকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সহযোগিতার পরিসর বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বহুমুখী প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে একক অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে (সুমিনার, পারওয়িতা ও রামসি, ২০২৫)। একই সঙ্গে গবেষণা সতর্ক করে যে স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি না হলে বিদেশি সহযোগিতা পূর্ণ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে পৌঁছায় না (সামান, ২০২৩)। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অস্ত্র আমদানি থেকে প্রযুক্তি শেখা, প্রযুক্তি শেখা থেকে রক্ষণাবেক্ষণ, এবং রক্ষণাবেক্ষণ থেকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা।

৩. অর্থনীতি ও বিনিয়োগ

মক্কা চুক্তির অর্থনৈতিক দরজাটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার এবং প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ৪.২৬৪ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৪.০৬ শতাংশ। এখন প্রয়োজন এই সম্পর্ককে শুধু শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা। সৌদি বিনিয়োগ বাংলাদেশে এলে তা শিল্প, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি, জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। উন্নত প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগকে শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে বলে গবেষণায়ও দেখা যায় (চেন ও জিয়াং, ২০২২)। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত বেশি রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বেশি বিনিয়োগ, বেশি উৎপাদন এবং বেশি কর্মসংস্থান।

৪. জ্বালানি নিরাপত্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি সরবরাহের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে শুধু সীমান্ত বা সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বৈদেশিক মুদ্রা, শিল্প উৎপাদন ও জনজীবন একসঙ্গে চাপে পড়ে। সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ, সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং বিকল্প উৎস তৈরির বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। তবে লক্ষ্য কোনো একটি উৎসের ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করা নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যবস্থায় পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার দেখিয়েছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু আমদানি নয়, নিজস্ব ও বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত। তাই একাধিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়ার সক্ষমতাই বাংলাদেশের শক্তি।

৫. দক্ষ মানবসম্পদ ও শ্রমবাজার

মক্কা চুক্তিররেকটি বড় সুযোগ নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। সৌদি আরব বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার হলেও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি কর্মী পাঠানো নয়, বেশি দক্ষ কর্মী পাঠানো। চিকিৎসা, প্রকৌশল, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি পেশায় দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ানো গেলে একই শ্রমবাজার থেকে বেশি আয় ও বেশি মানবসম্পদ সঞ্চয় সম্ভব। একইভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক শিক্ষা, প্রকৌশল, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। বিদেশে কর্মসংস্থান তখনই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শক্তিতে পরিণত হবে, যখন তা দক্ষতা, জ্ঞান ও আয়ের সঞ্চয় দেশে ফিরিয়ে আনবে। অর্থাৎ, শ্রমবাজারকে মানবসম্পদ গঠনের পথ বানাতে হবে।

৬. পাকিস্তানের সঙ্গে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান প্রশ্নটি ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল। ১৯৭১ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জাতীয় স্মৃতির কেন্দ্রীয় অধ্যায়। সেই ইতিহাস অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বর্তমান জাতীয় স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন কিছু সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করাও অস্বাভাবিক নয়। পাকিস্তান বর্তমানে ছয়টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে, মোট স্থাপিত ক্ষমতা ৩,৫৩০ মেগাওয়াট; দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এগুলো তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ জোগায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে পাকিস্তানে প্রায় ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যার বড় অংশ বিতরণভিত্তিক ব্যবস্থায় এসেছে। বাংলাদেশের জন্য এসব অভিজ্ঞতা সৌরবিদ্যুৎ, বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ, প্রকৌশল শিক্ষা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি, কৃষি, ওষুধ, বাণিজ্য ও গবেষণায় সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ইতিহাসের সত্য অক্ষুণ্ন রেখেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্বার্থে সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।

৭. ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তাগত হিসাবকে উপেক্ষা করা যাবে না। ২৮ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনাপ্রবাহ তারা পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও যোগাযোগ সম্পর্কও গভীর। ভারতের সরকারি হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভারসাম্য। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ভারতনির্ভরতা নয়। চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব থাকবে, কিন্তু চীননির্ভরতা নয়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়বে, কিন্তু নতুন কোনো শক্তিবলয়ের অনুসারী হওয়া নয়। সম্পর্কগুলো একে অন্যের বিকল্প হবে না; বরং বাংলাদেশের জন্য বিকল্প তৈরি করবে।

৮. বহিঃঅংশীদারিত্বকে জাতীয় সক্ষমতায় রূপান্তর

আমার প্রস্তাবিত সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর ষষ্ঠ বাহু, অর্থাৎ বহিঃজোট ও বিদেশি শক্তি, এই আলোচনায় একটি মৌলিক সতর্কতা দেয়। প্রশ্ন হলো, বিদেশি অংশীদারিত্বের ফল শেষ পর্যন্ত কার শক্তি বাড়াচ্ছে? দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও স্বার্থকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে বিদেশি অর্থ, প্রযুক্তি বা নিরাপত্তা সহযোগিতা কখনো কখনো জাতীয় সক্ষমতা না বাড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রকে শক্তিশালী করতে পারে। বিপরীতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জাতীয় শিল্পনীতির মাধ্যমে একই সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিদেশি অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়েও গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার এই গুরুত্ব উঠে এসেছে (বার্শ ও কোইভুমাকি, ২০১৯; রাজ্জাক, আন, আব্বাস ও হুয়াং, ২০২২)। চীনের অবকাঠামো সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি শুধু করিডোর ব্যবহারকারী রাষ্ট্র হবে, নাকি সেই অবকাঠামোর ভিত্তিতে শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদন গড়ে তুলবে? তাই মক্কা চুক্তির সাফল্যের মাপকাঠি হবে না কত অস্ত্র বা কত অর্থ এসেছে; বরং সহযোগিতা শেষে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তি, শিল্প, মানবসম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কতটা বেড়েছে।

৯. সিদ্ধান্তের সময় ও দর-কষাকষির ক্ষমতা

কৌশলগত বিকল্পের সবচেয়ে গভীর মূল্য প্রকাশ পায় সংকটের সময়। একটি রাষ্ট্র যদি জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বাজার বা অর্থায়নের জন্য একটি মাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সংকটে তাকে দ্রুত অন্যের শর্ত মেনে নিতে হতে পারে। তখন শুধু সম্পদের ওপর নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ের ওপরও নির্ভরতা তৈরি হয়। বিপরীতে, বিকল্প বেশি থাকলে রাষ্ট্রের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাড়ে, দর-কষাকষির পরিসর বাড়ে এবং প্রয়োজন হলে কোনো অংশীদারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাও বাড়ে। এখানেই কৌশলগত বিকল্পক্ষমতা সময়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। নির্ভরতা শুধু কে কত সম্পদ দেয় তার প্রশ্ন নয়; কে কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পায়, সেটিও তার প্রশ্ন।

১০. কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

শেষ দরজাটি আগের নয়টি দরজার সমষ্টিগত ফল। নিরাপত্তায় বিকল্প, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প, অর্থনীতি ও বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ, পাকিস্তানের সঙ্গে জ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, এবং বিদেশি অংশীদারিত্বকে জাতীয় সক্ষমতায় রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যদি নিজের বিকল্প বাড়াতে পারে, তাহলে সিদ্ধান্তের সময় ও দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে। তখন মক্কা চুক্তি শুধু একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতা থাকবে না; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সঞ্চয়ের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু ফল যদি হয় শুধু নতুন অস্ত্র, নতুন ঋণ এবং নতুন সরবরাহ-নির্ভরতা, তাহলে জোট হবে, নির্ভরতার কাঠামো বদলাবে না। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত একাধিক অংশীদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে নিজের শক্তি বাড়ানো। প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে একা থাকা নয়। এর অর্থ হলো, ভারতের সঙ্গে কাজ করা, চীনের সঙ্গে কাজ করা, সৌদি আরবের সঙ্গে কাজ করা, তুরস্কের সঙ্গে কাজ করা, পাকিস্তানের সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করা, কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখা। সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কারও ওপর কৌশলগত বন্দিত্ব নয়। জোটের শক্তি তখনই বাংলাদেশের শক্তি হবে, যখন শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী হবে বাংলাদেশ নিজেই।

ড. মো. আবু হাসান

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী

Email: hhafij@yahoo.com

এনজে