সিএমজেএফ ও সিএফএ সোসাইটির সেমিনারে বক্তারা
ব্যাংকিংখাতের উন্নয়নে সুশাসন ও আইনি সংস্কার জরুরি
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৯-১৯ ১৮:৫৯:৪১
সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিংখাত। মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ খাতটির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আলরাজী কমপ্লেক্সে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস’ ফোরাম (সিএমজেএফ) ও সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ব্যাংকিংখাতের আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সিএমজেএফের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যাংকিংখাতের বর্তমান পরিস্থিতি, আয়-ব্যয়, খেলাপি ঋণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। সিএমজেএফের সভাপতি মো. মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজের গবেষণা প্রধান সাকিব চৌধুরী, শান্তা সিকিউরিটিজের হেড অব রিসার্চ এস এম গালিবুর রহমান এবং সোনালী ব্যাংকের সিএফও ইকবাল হোসেন।
স্বাগত বক্তব্য দেন সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহতাব উর রহমান (ওসমানী)। বিশেষ বক্তা ছিলেন নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টসের চেয়ারম্যান মিনহাজ জিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিএমজেএফের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু সুদের হার বা সরকারি সিকিউরিটিজে আমানত রেখে ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে ব্যাংকগুলো মুনাফা করেছে। তবে ব্যাংকের মূল কাজ—ঋণ বিতরণ থেকে আয়—মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। ফলে প্রকৃত সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম কমেছে, যা পুরো ব্যাংকিংখাতের জন্য আশঙ্কাজনক।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে দেশের ব্যাংকিংখাতে মোট খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ ১৫ শতাংশ দেখানোর চেষ্টা করা হলেও নীতিসহায়তায় থাকা ঋণ যুক্ত করলে এর পরিমাণ ৩২ শতাংশের বেশি।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড ‘আইএফআরএস-৯’ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশনিংয়ের বাধ্যবাধকতা অনেক বেড়ে যাবে।
ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রায় ৭৫ শতাংশ খরচই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য। এর মধ্যে রয়েছে ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বিমা ব্যয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হলেও হুট করে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।
ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি ভালো ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের জন্য মার্জার হতে পারে। তবে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একসঙ্গে একীভূত করলেই সুফল পাওয়া যাবে—এমন সম্ভাবনা কম।
মাহতাব উর রহমান (ওসমানী) বলেন, সহজ ভাষায় ব্যাংকিংখাতের আর্থিক অবস্থা ও ক্যাপিটাল এডিকোয়েসি সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি। আর্থিক সচেতনতা বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাড়ানো গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা গুজবে কান না দিয়ে সঠিক তথ্য জানতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূলপ্রবন্ধে ব্যাংকিংখাত নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ধারণার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বলা হয়, ব্যাংকগুলো ঋণ না দিয়ে শুধু সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে বেশি আয় করছে—এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ বিনিয়োগ আয় হিসাব করা হয় মোট হিসাবে, আর ঋণের আয় হিসাব করা হয় আমানতের সুদ বাদ দিয়ে নিট হিসাবে।
২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর গ্রস সুদ আয় ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিনিয়োগের আয় বা নন-ইন্টারেস্ট ইনকাম ছিল ৮৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ।
মূলপ্রবন্ধে স্প্রেড ও নিট ইন্টারেস্ট মার্জিনের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকিংখাতে স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বিপরীতে নিট ইন্টারেস্ট মার্জিন ছিল ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এতে আরও বলা হয়, ব্যাংকে টাকা পড়ে থাকা মানেই ঋণ দেওয়ার মতো বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ থাকা নয়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিংখাতে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা অলস ছিল। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ০৪ শতাংশ অনুমোদিত সরকারি সিকিউরিটিজে আটকা ছিল। নগদ অর্থ বা ক্যাশে ছিল মাত্র ৩২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতির পেছনে শুধু ব্যাংকের অনিচ্ছা দায়ী নয় বলেও মূলপ্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের চাহিদাও কমেছে। এর প্রমাণ হিসেবে ২০২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়।
নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টসের চেয়ারম্যান মিনহাজ জিয়া বলেন, দেশের মোট সঞ্চয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যাংকিংখাতে জমা থাকে। পুঁজিবাজার বা অন্য খাতের অবদান সেখানে খুবই সামান্য। ফলে ব্যাংকিংখাত ভেঙে পড়লে দেশের পুরো অর্থনীতিই স্থবির হয়ে পড়বে।
ব্যাংকিংখাতের উন্নয়নে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাব দেন মিনহাজ জিয়া। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যের মডেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে বা বাইরে ‘প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি’ ও ‘ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি’র মতো পৃথক ও স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন। কারণ একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে ৫০-৬০টি ব্যাংককে গভীরভাবে তদারকি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে কঠিন।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তত ৫০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য যাতে ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটিতে থাকতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করার কথা বলেন। তাঁর মতে, ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বাধীন ক্রেডিট টিম এবং শতভাগ স্বাধীন পরিচালকদের সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারনাল কন্ট্রোল কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, দেউলিয়া আইন বা ব্যাংক্রাপ্সি অ্যাক্ট আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন মিনহাজ জিয়া। দ্রুত অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংস্কারের মাধ্যমে অকার্যকর ঋণগুলোকে বাজারে লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন তিনি।
মিনহাজ জিয়া আরও বলেন, যেসব ব্যাংকের সম্পদ শূন্য অথচ দায় অনেক বেশি, সেখানে নতুন বিনিয়োগকারী আসবে না। অতীতের ভুলনীতি বা রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জনগণের করের টাকায় বারবার এসব দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে যেগুলো টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়, সেগুলোর বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
বিএইচ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














