অবৈধ সিইও রফিকেই মজেছে সোনালী লাইফের বোর্ড

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৬-০৯-২২ ২৩:৫৭:২৫


  • আইন উপেক্ষা করেই আড়াই বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত সিইও রফিক
  • সরকারের নির্দেশেও হয়নি পরিবর্তন
  • স্থায়ী সিইও নিয়োগে বোর্ডের অনীহা?
  • শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
  • নীরব নিয়ন্ত্রকসংস্থা আইডিআরএ

বীমা আইন অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদ একটানা ছয় মাসের বেশি ভারপ্রাপ্ত রাখা যায় না। কিন্তু সেই বিধান উপেক্ষা করে প্রায় আড়াই বছর ধরে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত সিইওর দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম। একই সঙ্গে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, নতুন স্থায়ী মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ দেওয়া হলে বোর্ডের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেই দায়িত্বে রাখা হয়েছে। অতীতে এ পদে একাধিক প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পান মো. রফিকুল ইসলাম। এরপর টানা প্রায় ৩০ মাস ধরে তিনি একই দায়িত্ব পালন করছেন।

অথচ বীমা আইন, ২০১০-এর ৮০(৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো বীমা কোম্পানিতে প্রধান নির্বাহীর পদ তিন মাসের বেশি শূন্য রাখা যায় না। বিশেষ পরিস্থিতিতে আইডিআরএ সর্বোচ্চ আরও তিন মাস সময় দিতে পারে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যেই স্থায়ী মুখ্য নির্বাহী নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সোনালী লাইফে সেই বিধান দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত।

এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের এত স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা প্রায় আড়াই বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আরও প্রশ্ন উঠেছে, এ বিষয়ে আইডিআরএ কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

বিষয়টি নিয়ে এর আগেও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ৪ জুন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকটি বীমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই তালিকায় সোনালী লাইফের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী মো. রফিকুল ইসলামের নামও ছিল।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে পাঠানো ওই নির্দেশনার পর তালিকাভুক্ত অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও সোনালী লাইফে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং একই কর্মকর্তা এখনও ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন।

এর পাশাপাশি মো. রফিকুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একই সেশন, একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং একই বছরে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই তথ্য দুটি ভিন্ন ডিগ্রির ক্ষেত্রে কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

আইডিআরএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রফিকুল ইসলামের আগে জমা দেওয়া স্নাতকোত্তর সনদ গ্রহণ করা হয়নি। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করছেন এবং নতুন সনদ জমা দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং আইন নির্ধারিত সময়সীমা বহু আগেই শেষ হওয়ার পরও তাকে কীভাবে একই পদে বহাল রাখা হয়েছে।

বীমা খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহীকে বছরের পর বছর দায়িত্বে রাখার সুযোগ আইনে নেই। এ ধরনের ঘটনা শুধু বীমা আইন বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন তোলে না, বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহিও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই বিষয়ে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় প্রতিবেদক। কোম্পানির চেয়ারম্যান ও আইডিআরএ’র সাবেক সদস্য মইনুল ইসলামের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন প্রতিবেদক।

তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) বর্তমান চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনকে বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) জন্য একটি বিশেষ প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এ প্যানেলের মাধ্যমে সিইওদের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করা হবে। যাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকবে না, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই প্যানেল থেকে বাদ পড়বেন।

তিনি বলেন, ‘একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে তুলতে যা যা প্রয়োজন, আমরা তা-ই করব।’ বিমা কোম্পানিগুলোতে যোগ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও সৎ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের লক্ষ্যেই এই বিশেষ প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। যোগ্যতাহীন ব্যক্তিদের সিইও পদে নিয়োগের সুযোগ থাকবে না।

এএ