সরকারি ক্রয় আইন সংস্কার, নাকি অবাধ সিদ্ধান্তের সুযোগ?
সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৬-০৯-২৮ ২২:৫৯:১১
গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬” নামে অভিহিত। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিষয়গুলো হলো: সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের নামে বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি, নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি ও নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় পণ্য ক্রয়ে অগ্রাধিকার প্রদান এবং সীমিত ক্রয় পদ্ধতির প্রয়োগ ইত্যাদি।
সরকারি ক্রয়ের গুরুত্ব
সরকারি ক্রয় মানেই শুধু পণ্য, কাজ বা সেবা কেনা নয়, এটি জনগণের অর্থের ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি। একটি সড়ক নির্মাণ থেকে শুরু করে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষা অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা সরকারি সেবা প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে সরকারি ক্রয় ও চুক্তি জড়িত। আর এই অর্থের উৎস শেষ পর্যন্ত জনগণেরই অর্থ, করদাতার অর্থ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় তাই সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির ঘাটতি কোনো দপ্তরের নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এর সরাসরি আর্থিক প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। একটি প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়,অতিমূল্যায়িত দর, নিম্নমানের কাজ, অযৌক্তিক মূল্য পরিবর্তন, অপ্রতিযোগিতা মূলক ক্রয় কিংবা দুর্নীতির কারণে যে অর্থ অপচয় হয়, সেটি মূলত জনগণের অর্থেরই অপচয়।
অতীতের বিভিন্ন গবেষণাতেও সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম, যোগসাজশ এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতির গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একটি গবেষণায় ২০০৯–১০ থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সড়ক ও সেতু-সংক্রান্ত উন্নয়নকাজে মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এমন বাস্তবতায় সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী, স্পষ্ট, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ সরকারি ক্রয় আইন শুধু প্রয়োজনীয় নয় অপরিহার্য ও বটে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্ন: শুধু আইন থাকলেই কি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা স্বচ্ছ হবে? বাস্তবে এর উত্তর নির্ভর করবে :
# আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট,
# সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কতটা কাঠামোবদ্ধ,
# মূল্যায়ন কতটা বস্তুনিষ্ঠ,
# সিদ্ধান্তের কারণ কতটা প্রকাশযোগ্য এবং
# সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কতটা জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন তার ওপর।
অর্থাৎ, একটি ভালো ক্রয় আইন শুধু ক্ষমতা দেওয়ার বিষয় নয়; সেই ক্ষমতা কীভাবে, কোন মানদণ্ডে এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হবে—সেটিই হতে পারে এর প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
সংস্কারের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, ক্রয়চুক্তি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা। এসব উদ্দেশ্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে এই সংস্কার কি বাস্তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করবে, নাকি কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি বিবেচনাধিকার তৈরি করবে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্বার্থগোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে?
এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সুবিধা দেওয়া না হলেও, যোগ্যতা নির্ধারণ, মূল্যায়ন, টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, দেশীয় শিল্পের সংজ্ঞা, সীমিত দরপত্র কিংবা বিশেষ ক্রয়পদ্ধতির মতো জায়গায় অতিরিক্ত discretion থাকলে পরোক্ষভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার: মানদণ্ড কতটা স্পষ্ট?
দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন উৎসাহিত করা রাষ্ট্রের একটি যৌক্তিক নীতিগত লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে দেশীয় শিল্প’ বলতে কাকে বোঝানো হবে ?
বাংলাদেশে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশীয় শিল্প? নাকি স্থানীয় মালিকানা, উৎপাদন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কিংবা স্থানীয় কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট শর্ত থাকবে? আমদানিকারক, পরিবেশক, উৎপাদনকারী এবং সমন্বিত প্রযুক্তি-সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে পার্থক্য করা হবে? এই বিষয়গুলো বস্তুনিষ্ঠ ও পরিমাপযোগ্য না হলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা’ একটি নীতিগত লক্ষ্য থেকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের ইচ্ছাধীন ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আর যেখানে ইচ্ছাধীন সুবিধা প্রদানের সুযোগ থাকে, সেখানে স্বার্থের সংঘাত, প্রভাব এবং পক্ষপাতের সম্ভাবনাও স্বাভাবিকভাবে বাড়ে।
সীমিত দরপত্র ও বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা
সীমিত দরপত্র পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষায়িত পণ্য, সীমিত সরবরাহকারী বাজার বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত দরপত্র প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এর ফলে প্রতিযোগিতার পরিধি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত কেন দরপত্র সীমিত করা হলো? কোন বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হলো? একই যোগ্যতার অন্য প্রতিষ্ঠানকে কেন সুযোগ দেওয়া হলো না? সিদ্ধান্তটি কি পরবর্তীতে নিরীক্ষা বা স্বাধীন পর্যালোচনা করা যাবে? সীমিত দরপত্র একটি প্রয়োজনীয় ক্রয়পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু এটি যেন প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথ না হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতার পরিধি যত সীমিত হবে, সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে বিশেষ ক্রয়ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতিতে সব ক্রয়ের জন্য একই দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ‘ জরুরি প্রয়োজন’ একটি সংবেদনশীল বিষয়। এর সংজ্ঞা অস্পষ্ট হলে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিয়মিত ক্রয়ের বিকল্প পথে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জরুরিতার কারণ, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, সরবরাহকারী নির্বাচনের ভিত্তি, মূল্যের যৌক্তিকতা এবং পরবর্তী পর্যালোচনা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। জরুরি ব্যবস্থা ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকবে; প্রকৃত প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে তা ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়।
রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকি
এই সংশোধনীর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। তাই এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।কারণ, একটি আইন বা বিধিমালা নিরপেক্ষ ভাষায় প্রণীত হলেও, তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকলে পক্ষপাত বা প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।একজন কর্মকর্তা যদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রমাণ এবং নম্বর প্রদানের সুস্পষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য থাকেন, তাহলে বাইরের প্রভাব প্রয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। বিপরীতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় অংশ যদি ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সিদ্ধান্তের কারণ পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ না থাকে, তাহলে প্রভাব বিস্তার বা পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সুতরাং, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মূল সুরক্ষা হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মূল্যায়ন পদ্ধতি, যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের নিরীক্ষাযোগ্যতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে, যেখানে কর্মকর্তার বিবেচনাধিকার (discretion) থাকবে, সেখানে সেই বিবেচনাধিকার সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, লিখিতভাবে কারণ দর্শানো এবং প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায়, এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য প্রশাসনিক দক্ষতা বা ক্রয়প্রক্রিয়ায় নমনীয়তা বৃদ্ধি হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা স্বচ্ছতা, সমতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
অনলাইন ক্রয়ব্যবস্থা কি যথেষ্ট ?
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। দরপত্র দাখিল, উন্মুক্তকরণ, যোগাযোগ এবং নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। কিন্তু ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা থাকলেই সরকারি ক্রয় পুরোপুরি নিরপেক্ষ হয়ে যায় না।
ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে যে দরপত্র অনলাইনে দাখিল হয়েছে। কিন্তু টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন কে তৈরি করেছে, সেই স্পেসিফিকেশন কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা সরবরাহকারীর সুবিধা করছে কি না, টেকনিক্যাল মানদণ্ড কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সীমিত দরপত্র কেন করা হয়েছে অথবা মূল্যায়নকারী কীভাবে কারিগরি নম্বর দিল এসব প্রশ্ন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিজে থেকে সমাধান করে না। অর্থাৎ, ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরপেক্ষ ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করে না। ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে; কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন।
টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দরপত্র কাগজে-কলমে উন্মুক্ত হতে পারে, কিন্তু কারিগরি বিবরণ যদি এমনভাবে তৈরি করা হয় যা বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল বা সরবরাহকারীর সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিলে যায়, তাহলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
তাই উচ্চমূল্যের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড-নিরপেক্ষ টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, বাজার বিশ্লেষণ, পরিমাপযোগ্য কারিগরি শর্ত এবং প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে কারিগরি বিবরণ পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তিসংবলিত ক্রয় সিদ্ধান্ত। কোনো দরদাতা কেন বাদ পড়ল, কোন মানদণ্ডে কত নম্বর পেল, অন্য দরদাতা কেন বেশি নম্বর পেল, কেন সীমিত দরপত্র করা হলো, কেন বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা প্রয়োজন হলো কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান কেন দেশীয় শিল্প হিসেবে বিশেষ সুবিধা পেল—এসব সিদ্ধান্তের কারণ ক্রয় নথিতে স্পষ্ট থাকা উচিত। স্বচ্ছতা শুধু দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নাম নয়। স্বচ্ছতার অর্থ হলো সিদ্ধান্তটিও যেন ব্যাখ্যা করা যায়। একজন ব্যর্থ দরদাতা, নিরীক্ষক কিংবা পর্যালোচনাকারী কর্তৃপক্ষ যেন ক্রয় নথি দেখে সিদ্ধান্তের যুক্তি বুঝতে পারেন এটাই প্রকৃত জবাবদিহি।
আমি মনে করি না যে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বাদ দেওয়া সম্ভব বা প্রয়োজনীয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে ক্রয় কর্তৃপক্ষকে কিছু নমনীয়তা দিতেই হবে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা এক বিষয় নয়। আমাদের প্রয়োজন কাঠামোবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে থাকবে নির্দিষ্ট মানদণ্ড, পূর্বনির্ধারিত ওয়েটেজ, প্রমাণ, অনুমোদন, নিরীক্ষার নথিপথ এবং পর্যালোচনা ব্যবস্থা।
একটি কোম্পানি যদি শুধু দরপত্র জেতার জন্য খুব কম মূল্য দেয়, কিন্তু সরকারি ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাহলে নামমাত্র মোট মুনাফা থাকলেও অর্থায়ন ব্যয় সেই মুনাফার বড় অংশ খেয়ে ফেলতে পারে। তাই সরবরাহকারীদেরও দরপত্রে অংশগ্রহণের আগে মূল্যের পাশাপাশি সম্ভাব্য মুনাফা, অর্থায়নের প্রয়োজন, পাওনা আদায়ের সময়, ওয়ারেন্টির দায়, কর ও মূল্য সংযোজন কর এবং চুক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কারের সঙ্গে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখতে হবে ক্ষমতা যত বাড়বে, জবাবদিহিও তত বাড়াতে হবে। কারিগরি মূল্যায়নের গুরুত্ব বাড়লে নম্বর প্রদানের পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হতে হবে। দেশীয় শিল্পকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে দেশীয়’ হওয়ার মানদণ্ড বস্তুনিষ্ঠভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সীমিত দরপত্রের সুযোগ থাকলে তার যৌক্তিকতা নিরীক্ষাযোগ্য হতে হবে। বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা থাকলে জরুরি পরিস্থিতির সংজ্ঞা ও পরবর্তী পর্যালোচনা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আরও যেসব মৌলিক বিষয়ে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল:
১. রিটেনশন মানি
১০% রিটেনশন মানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে সাপ্লায়ার বা কন্ট্রাক্টরের কার্যকরী মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা-ভার তৈরি হয়ে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় বাড়তে পারে। তাই রিটেনশন মানির হার, সর্বোচ্চ সময়সীমা ও ফেরত দেওয়ার পদ্ধতি আরও স্পষ্ট ও ঝুঁকিভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে না রেখে দ্রুত রিলিজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
২. প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সীমা
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রকৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সব ধরনের প্রোকিউরমেন্টের জন্য একই সময়সীমা নির্ধারণ যৌক্তিক নয়। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে প্রোকিউরমেন্ট, উৎপাদন, শিপমেন্ট, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, স্থাপন ও পরীক্ষণের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের সময়সীমা পর্যাপ্ত নয়। সুতরাং, প্রকল্পের প্রকৃতি ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে সময়সীমার যৌক্তিকতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৩. সিগনিফিক্যান্ট লোয়েস্ট টেন্ডার (SLT)
পাবলিক প্রোকিউরমেন্ট সংশোধনী, ২০২৫-এ সিগনিফিক্যান্ট লোয়েস্ট টেন্ডার (SLT) একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর অনাকাঙ্ক্ষিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই SLT প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, যৌক্তিকতা যাচাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করা এবং এর অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা প্রয়োজন।
৪. সরবরাহকারী ও ক্রয়কারী উভয় পক্ষের সমান জবাবদিহি ও ন্যায্যতা
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় জবাবদিহির বিষয়টি শুধু সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ক্রয় ব্যবস্থায় সরবরাহকারী ও ক্রয়কারী উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট অধিকার, দায়িত্ব ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সরবরাহকারীর অনিয়মের ক্ষেত্রে যেমন জরিমানা, বর্জন বা নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে, তেমনি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া বা চুক্তি বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব বা ক্ষতি হলে উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকা উচিত। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ও বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন বা চুক্তি প্রদানে দীর্ঘ বিলম্বের ফলে মুদ্রার বিনিময় হার, প্রস্তুতকারকের মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও অর্থায়ন ব্যয় পরিবর্তিত হলে তার সম্পূর্ণ ঝুঁকি সরবরাহকারীর ওপর চাপানোর একটি প্রচলিত প্রবণতা রয়েছে, যার সমাধান জরুরি। সুতরাং, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কারণে চুক্তি সম্পাদনের নোটিশ (NOA) বা চুক্তি প্রদানে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ, মূল্য ও আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত প্রতিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখা প্রয়োজন।
শেষ কথা
সরকারি ক্রয় কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার নয়। এটি জনগণের অর্থের বিনিময়ে জনগণের জন্য সর্বোত্তম পণ্য, কার্য ও সেবা সংগ্রহের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এখানে দরদাতার রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা প্রশাসনিক প্রভাব নয় তার যোগ্যতা, কারিগরি সক্ষমতা, মূল্য, সেবার মান এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত ।
একটি সংশোধনী তখনই প্রকৃত অর্থে সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন তা প্রতিযোগিতা বাড়াবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়াবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণে নমনীয়তা দেবে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ দেবে না; এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করলে তার বিপরীতে শক্তিশালী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরীক্ষাযোগ্যতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
লেখক: মোঃ আল-আমিন ভূঞাঁ, অর্থনীতি বিশ্লেষক
Email: alamin.hs@gmail.com






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














