এক বছরে বদলে যাবে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা: অর্থমন্ত্রী
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-১০-০৪ ১৯:৫৪:৪৪
দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা আগামী এক বছরের মধ্যে পরিবর্তন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বর্তমান উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার হোসাইন সাদাত এবং মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসইসির কমিশনার তানভির হাবিব রহমান।
এসময় বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, অটোমেশন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। সিডিবিএলসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করেনি। ফলে পুঁজিবাজারকে এখন অর্থনীতির মতোই একটি বড় সংকট থেকে পুনরুদ্ধার করতে হচ্ছে। এটি কার্যত একটি উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম। এ জন্য যেসব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, তার অনেকগুলোই কঠিন ও বেদনাদায়ক। তবে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে পুঁজিবাজার কখনো সেভাবে প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায়নি। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু করেন এবং পরে মিউচুয়াল ফান্ড চালু করেন। এটি ছিল দূরদর্শী চিন্তা। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি অব্যাহত থাকেনি। পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অন্যান্য সহায়তাও সামগ্রিকভাবে আসেনি। বিচ্ছিন্নভাবে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিক পদ্ধতির অভাবে পুঁজিবাজার প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থায়ন ব্যবস্থা মূলত ব্যাংকনির্ভর ছিল। বিনিয়োগকারী, সরকার ও বেসরকারি খাত সবাই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। পুঁজিবাজার ছিল কেবল একটি বিকল্প। সরকার তহবিলের ঘাটতি মেটাতে উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। বেসরকারি খাতও উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি আমানত ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। সবাই যখন ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন এ ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই প্রশ্ন। এ কারণে হাই স্ট্রিট থেকে ওয়াল স্ট্রিটে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পুঁজিবাজারই এ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে সরকার সামগ্রিক পদ্ধতিতে কাজ করছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আরও অনেক পদক্ষেপ নেওয়া বাকি রয়েছে। পুঁজিবাজারে যেসব সম্ভাবনা থাকা উচিত ছিল, সেগুলোর অনেক কিছুই এতদিন বাস্তবায়িত হয়নি। এখন সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ছয় মাসে যে উন্নয়ন হয়েছে তাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অসন্তুষ্ট নন। তবে এখনো অনেক পথ বাকি রয়েছে। এই কাজ শুধু বিএসইসি একা করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকেই এ ব্যবস্থার অংশীজন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বীমা খাত, আইডিআরএ, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদেরও এ ব্যবস্থার অংশ হতে হবে। এতদিন প্রত্যেকে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। যার যার জায়গায় কাজ করলেও তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংযোগ ছিল না। পুঁজিবাজারের এটি ছিল আরেকটি বড় দুর্বলতা।
তিনি বলেন, এখন বিভিন্ন পক্ষকে একই জায়গায় নিয়ে এসে সম্মিলিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি একটি যৌথ উদ্যোগ। এখন পর্যন্ত এ কাজ ভালোভাবে এগোচ্ছে। সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হবে।
পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্টদের নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর সবকিছুর জন্য নির্ভর করা উচিত নয়। একজন ব্রোকার হিসেবে নিজেকে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হবে, একটি এক্সচেঞ্জ হিসেবে নিজেকে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি কোম্পানিকেও একইভাবে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদকদেরও নিজেদের দায়িত্ব থেকে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি আর্থিক ব্যবস্থা তখনই কার্যকরভাবে কাজ করে এবং সেখানে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়, যখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এর সুফল সবাই পায়। ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এর সুবিধাভোগী। বাজার ভালো করলে সবাই উপকৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো একটি অগভীর বাজার। বাজারে গভীরতা না থাকলে পর্যাপ্ত লেনদেনও সম্ভব নয়। তাই বাজারের গভীরতা তৈরি করতে হবে। এজন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। ভালো কোম্পানি ও ভালো করপোরেট গভর্ন্যান্সে বিশ্বাসী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন বাজারের অংশ হতে চাইবে না, যেখানে ক্যাসিনোর মতো পরিবেশ থাকবে। তাই বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে ভালো কোম্পানির অভাব নেই। তারা অপেক্ষা করছে। গত কয়েক মাসে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে আসার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, ওয়াল স্ট্রিটেও তিনি যে আস্থা দেখেছেন, তাতে তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছেন।
তিনি জানান, ওয়াল স্ট্রিটে বাংলাদেশের বিষয়ে যে সাড়া পাওয়া গেছে, তা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো। সেখানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে অনেক তথ্য রাখে এবং তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েই এসেছে। তাদের বাংলাদেশের নেতৃত্ব, সরকারের ঘোষিত ডিরেগুলেশন, বাজারে আসা স্বচ্ছতা এবং পুঁজিবাজারের পেশাদারিত্বের ওপর আস্থা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে এবং তাদের অনেকেই ঢাকায় আসবে। একই সময়ে সরকার নিউইয়র্কে ডলার বন্ড ফ্লোট করতে চাচ্ছে। হংকংয়ে বাংলাদেশ-নির্দিষ্ট ইকুইটি ফান্ড ফ্লোট করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড, স্থানীয় বন্ড ও স্থানীয় মুদ্রার বন্ডের দিকেও যাওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে। এতদিন বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল। সেই দিন এখন শেষ হচ্ছে। সরকার বাংলাদেশের পাবলিক ফাইন্যান্সের কাঠামো এবং বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তন করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাত কেন ব্যাংক থেকে এত বেশি ঋণ নেবে এবং এত বেশি সুদ দেবে, তার প্রয়োজন নেই। অর্থের খরচ কমাতে না পারলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও ডেরিভেটিভস গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। এসব বাজারকে অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার এখন সিকিউরিটাইজেশনের দিকেও যাচ্ছে। পদ্মা ও যমুনা সেতুর মতো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সিকিউরিটাইজেশন করা যায়। বেসরকারি খাত ও সরকারের জন্য এ ধরনের আরও অনেক আর্থিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করলে তার অর্থায়নের জন্য সরকারকে সবসময় অর্থ দিতে হবে এমন ব্যবস্থা আর চলবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে এবং সেই অর্থ পরিশোধ করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সরকারের অর্থ ও করদাতাদের অর্থ দিয়ে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা হবে না।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিতে হলে শুধু আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ওপর নির্ভর করা যাবে না। বাংলাদেশকে বাজারে গিয়ে নিজের অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি বছর বাংলাদেশের ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থা মিলিয়ে ১০ বিলিয়ন ডলার দিলেই সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বন্ড ও ইকুইটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো সাড়া পাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
পুঁজিবাজারের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইকোসিস্টেমের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে এবং নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কারণ তাদের তৈরি আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর পুরো আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসে কী করতে হবে বা কী করা যাবে না, তা বলে দেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে সংশ্লিষ্টদের নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













