শিল্পায়নে ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে, দুর্বল হচ্ছে পুঁজিবাজার
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-১০-০৫ ২১:৩৮:১২
গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ হলেও শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে শিল্পোদ্যোক্তাদের নির্ভরতা বাড়ছে ব্যাংকঋণের ওপর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে ব্যাংকিং মাধ্যমে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা অর্থায়ন হলেও পুঁজিবাজার থেকে এসেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় কমে গেছে লেনদেনের পরিমাণ। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে পুঁজিবাজারের স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ব্যাংক ঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করছেন। ফলে শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা কমছে।
তাদের মতে, বড় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ বাড়ানো না গেলে একদিকে ব্যাংক খাতের ওপর ঋণের চাপ বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা আরও দুর্বল হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি। কারণ, প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকঋণসহ বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহে আগ্রহী হন। এই প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করা সহজ হবে। এতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
অর্থনীতির আকার বাড়লেও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে শিল্পায়নের জন্য অর্থের জোগানে বাড়ছে ব্যাংকনির্ভরতা।
শিল্প খাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০২ কোটি টাকা, যা শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয়েছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন হয় ৬৭৯ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ।
একই চিত্র দেখা যায় তার আগের দুই অর্থবছরেও। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন হয়েছে ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৪১ কোটি টাকা বা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন ছিল ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আর পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ।
অর্থাৎ, শিল্প খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের অংশ এক শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। চার অর্থবছরের তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়নের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি হলেও পুঁজিবাজারের অংশ ক্রমেই কমেছে। এতে শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জোগানে পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য ভূমিকা কাজে লাগছে না।
পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার চিত্র স্পষ্ট। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গত এক বছরের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণেও বাজারের সীমিত গতি উঠে এসেছে। ২৩৮ কার্যদিবসে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬০২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৬৯৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এক বছর পর চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৭৫৬ কোটি ৩১ লাখ। তবে এই বৃদ্ধি বাজারের কাঙ্ক্ষিত গতির তুলনায় এখনও কম। গত এক বছরে কয়েক দিন লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও তা ধারাবাহিক হয়নি। ফলে সাময়িকভাবে লেনদেন বাড়লেও বাজারে স্থায়ী গতি ফেরার লক্ষণ দেখা যায়নি।
এই সময়ে ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে চলতি বছরের ১২ জুলাই। ওই দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। বিপরীতে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর, ২৬৭ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন লেনদেনের এই ব্যবধানও বাজারের লেনদেনে ধারাবাহিকতার অভাবকে স্পষ্ট করে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারের আকার বাড়ছে না। ফলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ছে। বাজার বড় না হওয়ায় লেনদেনের পরিমাণ বা ভলিউমও বাড়ছে না। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক ব্রোকারেজ হাউস রয়েছে। পর্যাপ্ত ব্যবসা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই পুঁজিবাজারের গভীরতা, পরিধি ও আকার বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিএসইসি পুঁজিবাজারমুখী করতে চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। কারণ পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত দুর্বলতা। তাই উচ্চপর্যায়ে মূল্যায়ন করে কেন প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে না এবং এ ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
পুঁজিবাজারে নতুন ও মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তির সংকট কাটাতে ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি ব্লু-চিপ কোম্পানিকে ডিরেক্ট লিস্টিং বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারি, বহুজাতিক ও দেশীয় বড় কোম্পানিগুলোকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে ভালো কোনো আইপিও বা নতুন লিস্টিং হয়নি। এ অবস্থায় বাজারে নতুন ও মানসম্মত সিকিউরিটিজ আনার জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিও বিধিমালা সহজ করার কাজও চলছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি ব্লু-চিপ কোম্পানিকে ডিরেক্ট লিস্টিং অথবা আইপিওর মাধ্যমে বাজারে নিয়ে আসা হবে। সেটা সরকারি কোম্পানি হতে পারে, বহুজাতিক কোম্পানি হতে পারে বা দেশীয় ব্লু-চিপ হতে পারে।
নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনতে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে। ইস্যুয়াররা যাতে পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হয়, সেজন্য আইপিও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে লিস্টিং ফিতে ছাড় এবং সভরেন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বাজারের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানান ডিএসই চেয়ারম্যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে গেলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে দুই থেকে আড়াই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। বিপরীতে, কোনো কোম্পানি যখন প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে যায়, তখন ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত তার সক্ষমতা যাচাই করে দুই-তিন মাসের মধ্যেই অর্থায়ন করতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ে ব্যাংক থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ এবং পুঁজিবাজারে অর্থ সংগ্রহের দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিল্পের যে প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে পুঁজিবাজারের ভূমিকা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নে এক ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে হলে ব্যাংকগুলো অনেক সময় নিজেরাই অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোকে করপোরেট গভর্ন্যান্সের কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি রিপোর্টিং ও কমপ্লায়েন্সের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তালিকাভুক্ত না থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে এ ধরনের রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা তুলনামূলকভাবে কম।
শিল্পায়নে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের জটিলতা এবং ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থায়নের সহজলভ্যতার সমন্বিত প্রভাবেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
আল আমিন বলেন, ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি ও সর্বোচ্চ মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন করবে—এমন নীতিগত ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করলে সময়ের ব্যবধানের কারণে খেলাপি ঋণ বা এনপিএল (নন-পারফর্মিং লোন) তৈরির ঝুঁকি থাকে। রাজনৈতিক কারণেও এনপিএল তৈরি হয়, আবার এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কারণেও তা তৈরি হতে পারে।
তার মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি ব্যাংকের উপযোগী স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নের দায়িত্ব পালন করে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দায়িত্ব পুঁজিবাজার নেয়, তাহলে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। অন্যথায় ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নের বর্তমান ভারসাম্যহীনতা থেকেই যাবে।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













